অনলাইন ডেস্কঃ চাচাতো বোনকে পানিতে ফেলে হত্যা মামলায় ১৯৯৪ সালে যাবজ্জীবন সাজা হয় পেয়ারা আক্তারের (৩৭)। তখন তিনি ‌পি‌রোজপু‌রের স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। বিদ্যালয় থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। যাবজ্জীবন (৩০ বছর) সাজা হওয়ার পর ছিলেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে।

২৬ বছর কারাভোগের পর বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকের সুপারিশে বিশেষ বিবেচনায় চার বছর আগেই সাজা মওকুফ হয়। বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান পেয়ারা। কারামুক্তির পর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছিলেন তিনি। সম্বলহীন দুই ভাই অর্থাভাবে বৃদ্ধ মা এবং কারামুক্ত বোনের পাশে দাঁড়াতে পারেননি। সেই কারামুক্ত পেয়ারা আক্তারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলেন বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ১১টায় বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে পেয়ারাসহ কারামুক্ত নারী-পুরুষদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সেলাই মেশিন ও ভ্যান উপহার দেওয়া হয়। বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতায় অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির পক্ষ থেকে এ উপহার তুলে দেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি পেয়ারাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করারও প্রতিশ্রুতি দেন জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার।

২৬ বছর আগের ঘটনা মনে করেন কারামুক্ত পেয়ারা। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে জানান, জমিজমা নিয়ে চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের বিরোধ ছিল। এর জের ধরে ওই সময় চাচাতো বোন পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার পর তাঁকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। এরপর বিদ্যালয় থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পেয়ারার দাবি, ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে পুলিশ। ওই স্বীকারোক্তির কারণেই তাঁকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দুই ভাই আদালতে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সহায়-সম্বল সব বিক্রি করেও তাঁকে মুক্ত করতে পারেননি। কারামুক্তির পর নিঃস্ব পেয়ারা বাকি জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

আবেগ আপ্লুত পেয়ারা বলেন, ‘বরিশালের জেলা প্রশাসক স্যার কারাগারে আইলে স্যাররে আমি সব ঘটনা খুইল্লা বলি। এর পর আমার দণ্ড মওকুফের ব্যবস্থা করেন জেলা প্রশাসক। এহন সেলাই মেশিন দিয়া আমার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন। একটা চাকরির ব্যবস্থাও করে দেওনের আশ্বাস দিছেন। এত্ত কিছু পামু, স্বপ্নেও ভাবি নাই।’

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘সমাজসেবা বিভাগের অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির পক্ষ থেকে কারাগারে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও জীবিকা নির্বাহের সরঞ্জাম দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাড়ি ফিরে যাতে তাঁরা সম্মানের সঙ্গে কাজ করে বেঁচে থাকতে পারেন, সে লক্ষেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, ‘পেয়ারা আক্তার ২৬ বছর জেল খেটেছেন। তিনি যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এ ছাড়া জেলখানার হাজতিদের সেলাই মেশিন, ভ্যান দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাঁরা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের আমরা সুপথে ফিরিয়ে আনব। সবার সহযোগিতা ও বিত্তবানদের এ কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’

পেয়ারা ছাড়াও সাধারণ ক্ষমতায় কারামুক্ত হিজলা উপজেলার আবদুর রহমানকে (৫৯) ভ্যানগাড়ি, কারাভোগের পর প্রবেশনে থাকা হিজলা উপজেলার খালেদা বেগম (৩৫) এবং বরিশাল নগরীর অপর এক নারী আশা আক্তারকে (৩২) একটি করে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গৌতম বাড়ৈ, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত বিশ্বাস দাস, জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার দাস, জেলা প্রশাসনের প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সূত্রঃ কালেরকণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here