অনলাইন ডেস্কঃ ঈদের দিনে সকাল শুরুই হয় সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদ দিয়ে। সকালে সেমাই মুখে দিয়ে নামাজে যাওয়ার চল আমাদের দীর্ঘদিনের। কোর্মা পোলাও মাংস যা-ই থাকুক না কেন, বাদাম চিনি দেওয়া সেমাই না থাকলে ঈদ পূর্ণতা পায় না বাঙালির ঘরে। শুকনো জর্দা সেমাই হোক আর ঘিয়ে ভাজা দুধে ভেজানো লাচ্ছা সেমাই—যেমনই হোক না কেন, ঈদের দিনে সেমাই চাই-ই।

ঈদের আনন্দ আর সেমাই যেন সমার্থক। চিরায়ত বাংলার খাবার না হলেও উপমহাদেশের মুসলিমদের সেমাই যেন ঈদ আনন্দ উদ্যাপনের প্রধানতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এটি খুবই জনপ্রিয় খাবার, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ‘সেমাই’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করতে গিয়ে  জানিয়েছেন, গ্রিক সেমিদালিস শব্দ থেকে সেমাই শব্দের উৎপত্তি। সেমাই আফগানিস্তানে সেমিয়া, পাকিস্তানে সেঁওয়াই নামে পরিচিত। ইরানেও সেমাইয়ের চল আছে। ধারণা করা হয়, ঐ সব দেশ থেকেই একসময় সেমাই এ দেশে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে তা বাঙালি মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান এক খাদ্য-ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তবে সেমাই শব্দ হিসেবে গ্রিক হলেও খাদ্য হিসেবে গ্রিক নয়।সেমাইয়ের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ধান যেসব অঞ্চলে উৎপন্ন হয়, সেসব অঞ্চলে চাল থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক আগে। সেমাইও সেই ধারার একটি খাবার। ‘ভার্মিচিলি’ গোত্রের যে খাবারটি রয়েছে, যার জনপ্রিয় প্রজাতি হিসেবে আমরা পাস্তা, নুডলস ইত্যাদি খাবারকে চিনি, সেই খাবারের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের একটি ধরন হিসেবে সেমাইয়ের উল্লেখ করা যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটি সেমাই ও সিমুই হিসেবে পরিচিত। আবার তামিল ও মালয়ালাম ভাষায় এটি সেভাই, কন্নড় ভাষায় সেবিজ, তেলেগু ভাষায় সেভেলু বা সেমিয়া, তামিলে সেমিয়া, হিন্দি, উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় এটি সেভিয়াঁ, ওড়িয়া ভাষায় সিমাই, গুজরাঠি ভাষায় সেভ নামে পরিচিত। যেসব ভাষার কথা বলা হলো সেসব দেশে সেমাইয়ের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রন্ধনপ্রণালী। তবে বেশির ভাগ অঞ্চলেই মিষ্টিজাতীয় খাবার হিসেবেই পরিচিত।

অনেকেই মনে করেন, সেমাই পার্শিয়ান খাবার যেটি মোগলদের হাত ধরে ভারতে আসে এবং ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জানা যাচ্ছে, পার্শিয়ান খাবার রেস্তেহ বা তুরস্কের খাবার কেস্মে বা এরিস্টের সঙ্গে সেমাইয়ের আকৃতিগত কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও স্বাদের ফারাক বিশাল। কেস্মে বা এরিস্ট কিংবা রেস্তেহ এগ নুডলস হিসেবে খাওয়া হয়। আর সেমাই খাওয়া হয় মিষ্টি খাবার হিসেবে। রান্না হওয়ার আগে সেমাই হলো একধরনের ময়দার সুতো। প্রাচীনকাল থেকেই সেমাই তৈরি করা হতো হাতে। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে হাতে তৈরি সেমাই বানানোর চল আছে। হাঁসের মাংস দিয়ে সে সেমাই খাওয়ার রেওয়াজেও পরিণত হয়েছে সেসব অঞ্চলে। তবে সেমাই মিষ্টি খাদ্য হিসেবেই সাধারণ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। যেমন রাজশাহী জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো হাতে তৈরি সেমাইয়ের প্রচলন রয়েছে। এই অঞ্চলে এখনো নারীরা বাজারের কেনা সেমাইয়ের পাশাপাশি বাড়িতে হাতে সেমাই বানায়। এই অঞ্চলের মানুষ ঈদে যে ‘জামাই সাজন’ পাঠায়, তার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো হাতে বানানো সেমাই।

কদর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরেক রকমের সেমাই পাওয়া যায় বাজারে। সেখানে প্যাকেটজাত শুকনো লম্বা সেমাই যেমন আছে, তেমনি আছে লাচ্ছা সেমাই। এই ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেমাই’ বা কারখানায় বানানো সেমাই বেশ লম্বা আকৃতির হয়ে থাকে। কারখানায় বানানো লম্বা আকৃতির সেমাই এখন বেশি চালু। তবে বগুড়ার চিকন সেমাই বাঙালিদের কাছে পেয়েছে বিশেষ সেমাইয়ের মর্যাদা।

হাতে বানানো সেমাইয়ের দুটি ধরন রয়েছে। একটি হাতে ডলে ডলে বানানো সেমাই, অন্যটি হাতে ঘোরানো যন্ত্র দিয়ে বানানো সেমাই। হাতে ডলে বানানো সেমাইয়ের প্রচলন প্রাচীন। চালের আটা ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে মণ্ড বানিয়ে সেই মণ্ড পরিমাণ মতো হাতে নিয়ে ডলে ছোট ছোট লম্বা সরু নালি তৈরি করা হয় প্রথমে। তারপর সেখান থেকে পরিমাণমতো কেটে নিয়ে সেমাই বানানো হয়। সেগুলোকে রোদে শুকিয়ে রেখে ঈদের দিন রান্না করা হয় দুধ দিয়ে। পরবর্তীকালে সেমাই বানানোর যন্ত্র আবিষ্কৃত হলে সেই যন্ত্রে সেমাই বানানোর প্রচলন হয়। যন্ত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ আটার মণ্ড রেখে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেমাই তৈরি করত বাড়ির মেয়েরা। যদিও এখন এই সেমাই তৈরি করা একেবারে হারিয়েই গেছে।

বগুড়ার চিকন সেমাই: বগুড়ার চিকন সেমাইয়ের কদর বহুদিনের। তবে এখন এর প্রস্ত্ততপ্রণালিতে নতুনত্ব ও আভিজাত্য আসায় সারা দেশেই সমাদৃত বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী সাদা সেমাই। ঈদের আগে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী এই চিকন সেমাইকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। যুগ যুগ ধরে দইয়ের পাশাপাশি বগুড়ার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে চিকন সেমাই। এখন বগুড়ার চিকন সেমাই বিদেশে বিভূঁইয়ের গর্বিত পরিচয়ে পৌঁছেছে। চিকন সেমাই এখন গ্রামের হাটবাজার থেকে নগরীর শপিংমল হয়ে রাজধানীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের অদূরে করতোয়া নদীর কোল ঘেঁষে বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শেওলাগাতি, কালিসামাটি, সাবগ্রাম, শ্যামবাড়িয়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে এই সেমাইপল্লি। অর্ধশতাব্দী ধরে এখানে তৈরি হচ্ছে হরেক রকমের চিকন সেমাই। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে ‘চিকন সেমাইপল্লি’ এখন বেশ সরগরম। শতাধিক কারখানায় নারী কারিগরেরা দিনেরাতে বিদ্যুৎ ও হস্তচালিত সেমাইকলে সেমাই তৈরি এবং তা রোদে শুকানো ও প্যাকেটজাত করার কাজে ব্যস্ত। চিকন সেমাইপল্লিতে আলাপ করে জানা যায়, ঈদ সামনে রেখে এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ টন সেমাই উৎপাদন হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসব সেমাই নিয়ে যান। এই সেমাই তৈরির কাজে নিয়োজিত আছেন চার শতাধিক নারী।

প্রায় ৫০ বছর ধরে চিকন সেমাই তৈরির করছেন শহরতলী বেজোড়া-ঘাটপাড়ার কারিগর আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ভারত ও পাকিস্তান থেকে কয়েকজন কারিগর চিকন সেমাই তৈরির কৌশল শিখে এসে বগুড়া শহরতলির চারমাথা-গোদারপাড়া এলাকায় প্রথম চিকন সেমাই তেরি শুরু করেন। তা পরবর্তীকালে দুলু মিয়া, শাহের আলী, খোকা মিয়া ও জাবেদ আলী নামের কারিগরদের হাত ধরে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে চিকন সেমাই তৈরির কাজ। এর মধ্যে বিশেষ করে বেজোড়া এলাকা পরিচিতি পায় চিকন সেমাইপল্লি হিসেবে।

বাগেরহাটের ঐতিহ্য: বাগেরহাট অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী পিঠা হলো ‘সেমাই পিঠা’। বাগেরহাটের স্থানীয়দের কাছে এটি মূলত ‘শিয়েই পিঠা’, শেয়াই পিঠা’ বা ‘শিয়াই পিঠা’ নামেই পরিচিত। বছরের যে কোনো সময়ই বিশেষ করে বাড়িতে মেহমান এলে এই পিঠা বানানো হয়। একটা সময় ছিল যখন এ অঞ্চলের মানুষ মেহমান আপ্যায়নে খাবারের অন্যতম প্রধান পদ হিসেবে রাখা হতো এই পিঠা। এখনো মেহমান এলে বিভিন্ন বাড়িতে এই পিঠা বানানো হয়। নতুন জামাইকে আপ্যায়নসহ যে কোনো অনুষ্ঠানে বা বিশেষ দিনগুলোতে এ অঞ্চলের মানুষ ভাতের বিকল্প হিসেবে দুপুরে ও রাতের খাবারে শেয়াই পিঠা খেয়ে থাকেন। শীতের শুরুতে বাগেরহাটের বিভিন্ন স্থানে শেয়াই পিঠার উৎসবও হয়ে থাকে। সেমাই পিঠা দেখতে কিছুটা নুডলসের মতো। এই পিঠা বানাতে হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কাঠ দিয়ে তৈরি বিশেষ ঢেকিকল বা পিতলের তৈরি মেশিনের সাহাঘ্যে। পিঠা খেতে হয় অবশ্য কিছুটা ভাতের মতোই মাংস দিয়ে। এসব এলাকার মানুষ চুইঝাল দিয়ে রান্না হাঁস, মুরগি বা গরুর মাংস দিয়ে সেমাই পিঠা খেতে বেশি পছন্দ করেন। তবে হাঁসের মাংস দিয়ে সেমাই পিঠার স্বাদ সবচেয়ে বেশি ভালো এবং এটাই বেশি জনপ্রিয়। আর যদি হয় চুইঝাল দিয়ে রান্না চায়না হাঁস বা রাজহাঁসের মাংস, তাহলে তো কথাই নেই। সূত্রঃ ইত্তেফাক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here