অনলাইন ডেস্কঃ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে থামছেই না হানাহানি। তিন ধাপের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে গতকাল পর্যন্ত ৭৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা নিয়ে মাত্র ৯৯ ভোট পেয়ে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি খোদ দলের ভিতরেই প্রশ্ন উঠেছে, এসব প্রার্থীদের মনোনয়নের তালিকা পাঠায় কারা? কীভাবে তারা নৌকা পান। এরকম পরিস্থিতি মোটেও দলের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

এখানেই শেষ নয়, ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেলেও তৃতীয় ধাপে ১৮১ ইউপিতে তৃতীয় অবস্থানেও থাকতে পারেনি সংশ্লষ্ট প্রার্থীরা। দলীয় বিদ্রোহী, বিএনপির ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীদের কাছেও পরাজয় হচ্ছে। বারবার তাগাদা দিয়েও বিদ্রোহীদের দমন করা যাচ্ছে না।

দলীয় সূত্রমতে, জেলা-উপজেলা থেকে তথ্য গোপন করে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার এবং তাদের সন্তানেরাও বাগিয়ে নিচ্ছেন নৌকা। অস্ত্র মামলা, দুর্নীতির দায়ে দুদকের চলমান মামলার আসামির হাতেও উঠছে নৌকা। এলাকায় জনপ্রিয়তা না থাকলেও বিতর্কিতরা নৌকার দৌড়ে এগিয়ে থাকায় বিদ্রোহীর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে যোগ্য ব্যক্তিরাও বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন। তৃতীয় ধাপে ৪৭ দশমিক ০৬ শতাংশ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় ঘটেছে। নির্বাচনী সংঘাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ নিহত হয়েছেন ১৩ জন।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ইউপি নির্বাচন একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ের। এখানে গোষ্ঠী, পরিবার ও পেশিশক্তি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এবাড়ি-ওবাড়ি দ্বন্দ্ব থাকে। ইউপি নির্বাচন এলে এসব দ্বন্দ্ব উসকে ওঠে। গত সোমবার দলীয় এক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে কিছু অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ভোটারদের উপস্থিতি সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তৃণমূল থেকে যে তালিকা আমরা পাচ্ছি, সেটি কি আসলেই মাঠের চিত্র নাকি নেতা-এমপিদের পছন্দের প্রার্থী? মনোনয়ন যাদেরকে দেওয়া হচ্ছে সেখানে কি তৃণমূলের চাওয়ায় হচ্ছে, নাকি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে? সেগুলো এখন বিচার বিশ্লেষণের সময় এসেছে। কারণ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে দেউলিয়া হয়ে যায়নি যে ৯৯ ভোট পায়। একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের দলীয় পদ-পদবি আছেন এমন নেতারাও ভোট দিলে হাজার ছাড়িয়ে যাবে। কারা নৌকা পাচ্ছে, কাদের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে, সেখানে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু রয়েছে, নাকি তৃতীয় পক্ষ নৌকার প্রতীক চাচ্ছে- সবই জানতে হবে। অনেকে কষ্ট পেয়ে বিদ্রোহী হয়েছেন, কিন্তু তাদেরকে বোঝানোর দায়িত্বটা কে নিবে? উৎসবমুখর ভোট এখন দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আবদুর রহমান বলেন, তৃণমূল থেকে যে তালিকা আসে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করেই নৌকা দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকারের  নির্বাচনে হানাহানি অতীতেও হয়েছে। তবে এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, যারাই বিদ্রোহী হয়েছে আমরা তাদের ভবিষ্যতে পদ-পদবি দেব না। যারাই এদের পক্ষে তদবির করবে তাদেরও সমান দোষী হিসেবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।

সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে গত নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন আতিকুর রহমান খান শান্ত। সরকারি ৪০ লাখ টাকার চাল চুরির ঘটনায় আতিকুর রহমান খান স্থানীয় মন্ত্রণালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার হন। পরে স্থগিত করা হয়। এর আগে এই শান্ত চেয়ারম্যান সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং বিআইডব্লিউর জায়গা জোর করে দখল করায় সরকার বাদী হয়ে মামলা করে। আতিকুর রহমান শান্তকে এবারও দলীয় প্রার্থী করার তোড়জোড় শুরু করেছেন স্থানীয় একটি অংশ। তবে বিতর্কিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীকে নৌকা না দিতে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি আগা খান মিন্টু। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বিগত নির্বাচনের এই বিদ্রোহী এবার নৌকা পেতে স্থানীয়ভাবে দলীয় মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন। জানতে চাইলে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো বিদ্রোহী প্রার্থীকে নৌকার জন্য সুপারিশ করতে পারব না।’

তৃণমূল নেতারা জানিয়েছেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে দলীয় পদ-পদবি থাকার পরও নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানো এবং কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন তৃণমূল নেতারা। নির্বাচন শুরু হলেই কেন্দ্র ও তৃণমূল থেকে বলা হয়, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই ব্যবস্থা। প্রথমে সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও পরে স্বপদে বহাল করা হয়। এখানেই শেষ নয়, তাদের দলীয় পদ-পদবি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। গত ২০১৯ সালে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী ছিলেন আবদুল লতিফ অমল। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোর্তুজা ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নজরুল মল্লিক। দুই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভরাডুবি হয় নৌকার। নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। শোনা যাচ্ছে আগামী ২১ ডিসেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে আবারও তিনিই সভাপতি হবেন। ঘোষণা বাকি মাত্র। সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক প্রার্থী থাকলেও সভাপতি পদে এখনো কেউ আলোচনায় নেই। ২০১৯ সালে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল আলম। বিদ্রোহী প্রার্থী হন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপি আলী আজগার টগরের ছোট ভাই দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক আলী মনসুর বাবু। ভাই এমপি হওয়ায় পুরো এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে। বিদ্রোহী ভাইকে বিজয়ী করতে বড় ভূমিকা রাখেন এমপি আজগর আলী। আর এ কারণে জয় পান আলী মনসুর বাবু। এখানেই শেষ নয়, বিদ্রোহী প্রার্থী বাবু দলের দফতর সম্পাদক থেকে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এখন সে দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ প্রত্যাশী।

তৃণমূল নেতারা বলছেন, বিদ্রোহীদের নিয়ে লুকোচুরি চলতে থাকায় নৌকার ভরাডুবি ঘটছে। অতীতের উপজেলা নির্বাচনের মতোই চলতি বছরে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ ভোটেও বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘কাউকে বড় শাস্তির মুখে পড়তে হবে না’-এমন মনোভাব দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে নৌকার পরাজয় ঘটছে। এমনকি সর্বনিম্ন ভোটে লজ্জার হারের ঘটনাও ঘটছে। সূত্রঃ বিডি প্রতিদিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here