অনলাইন ডেস্কঃ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সারা দেশে দলীয় প্রতীকে ভোট হলেও আওয়ামী লীগের দুর্গখ্যাত মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে নৌকা ছাড়া ভোট হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগ এবং দলীয় সংসদ সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ দুটি জেলা ‘উন্মুক্ত’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে কয়েক দিন ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্যে গত শনিবার এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। তৃতীয় ধাপে শরীয়তপুরের গোসাইহাট উপজেলার ইউপিতে কাউকে নৌকা দেওয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও দলীয় এমপিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে দলীয় প্রার্থী করা হয়নি। সেখানে নির্বাচন উন্মুক্ত করা হয়েছে।’ চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মাদারীপুরের দলীয় তিন এমপি (মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান এবং মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ) ইউপিতে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ না করতে দলীয় সভানেত্রীকে চিঠি দেন। ফেব্রুয়ারিতে চিঠি দেন শরীয়পুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু, শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক এবং জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার ও সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে। তারা নৌকা না দিতে দলীয় সভানেত্রীকে অনুরোধ করেন।

এ প্রসঙ্গে শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা নেত্রীকে জানিয়েছিলাম, জেলার ৬৪টি ইউনিয়নে যারা অংশ নিতে চান তারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী। এ জেলাতে বিএনপিসহ অন্য কোনো দলের সাংগঠনিক শক্তিও নেই, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো লোকও নেই। সে কারণে দলীয় প্রতীকে ভোট না করে উন্মুক্ত রাখার দাবি করেছি। কারণ অনেকেই যোগ্য প্রার্থী। একজনকে বেছে নেওয়া কঠিন। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বাসী যারাই বিজয়ী হবেন তারাই আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান। মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার সঙ্গে আমরা একমত। কেন্দ্রীয় নির্দেশ মোতাবেক আমরা তৃণমূল থেকে নামও পাঠিয়েছিলাম এবং কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন ফরমও বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক মাদারীপুরে দলীয় প্রতীক দেওয়া হয়নি।

প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পর তৃতীয় ধাপেও অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি নৌকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। গতকাল সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের ধলবাড়ীয়া ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী রাজাকারপুত্র গাজী শওকত হোসেনের মনোনয়ন বাতিলের জন্য ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন ইউনিয়নের দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা। ইউনিয়ন কার্যালয়ে মানববন্ধনে নেতা-কর্মীরা দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মানববন্ধনে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ধলবাড়ীয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাপস মন্ডল, ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুবক্কর গাইন, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিশ্বজিৎ ঘরামি, সম্পাদক সুদার্শন সরকার, ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি শেখ আমিনুর রহমান প্রমুখ।

 

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি বর্তমান চেয়ারম্যান ফিরোজ উদ্দিন। চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সাময়িক বহিষ্কারও করা হয়েছিল। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-সচিব মো. ইফতেখার আহমেদ উদ্দিন চৌধুরী স্বাক্ষরিত পত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, উল্লাপাড়া থানার জিআর ৭৬০/০৩ মামলায় ফিরোজ উদ্দিনকে আদালত ছয় মাসের সশ্রম কারাদন্ড ৫০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদন্ডাদেশ দেন। অপরাধমূলক কর্মকান্ড ইউনিয়ন পরিষদ আইনবিরোধী হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ-২০০৯ আইন অনুযায়ী ফিরোজ উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু চেয়ারম্যান হাই কোর্টে রিট করে আদেশটি স্থগিত করেন। চেয়ারম্যান ফিরোজ উদ্দিন সব তথ্য গোপন করে তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম কেনেন এবং তদবির করে নৌকা প্রতীক পান বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরিফুর ইসলাম লিটন বলেন, মাদক মামলায় সাজার বিষয়টি অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন রেখে ফিরোজ উদ্দিন মনোনয়ন হাতিয়ে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজাবাড়ীর বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ছিলেন রেজাউল করিম। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি নৌকার মাঝি হয়েছেন। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই অবস্থা জেলার কালুখালীর মদাপুরে নৌকা দেওয়া হয়েছে এ বি এম রোকনুজ্জামানকে। রোকনুজ্জামান একসময়ে সর্বহারা পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি রাজাকারের নাতি বলে অভিযোগ রয়েছে।

৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন মো. আবদুল আজিজ হাওলাদার। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তিনি। নৌকা প্রতীকে মনোনয়নের জন্য চারজনের একটি তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল উপজেলা আওয়ামী লীগ। সেই তালিকার ১ নম্বরে ছিল আবদুল আজিজ হাওলাদারের নাম। তবে তিনি নন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পেয়েছেন রাজাকার সন্তান এবং সাবেক বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন খান। মাত্র চার মাস আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন খান। দলে যোগ দিয়েই পেয়ে গেছেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক স্বাক্ষরিত কাগজে তাকে ৪ নম্বর দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। শান্তি কমিটির সদস্যের সন্তান ও বিএনপি নেতার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে গত শনিবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন ৪ নম্বর দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ হাওলাদার। আবেদনে তিনি জানান, নৌকা মনোনয়ন পাওয়া আনোয়ার হোসেন খানের পিতা মৃত জেন্নাত আলী খান ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তাদের সমগ্র পরিবার বিগত সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তিনি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ২০০৩ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে ছিলেন।  এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, আমি ২৮ বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলাম। আনোয়ার হোসেন খানের পরিবার আওয়ামী লীগের নয়। এর আগে সে আওয়ামী লীগ করেছে এমন তথ্যও আমার জানা নেই। বর্তমানে কীভাবে আওয়ামী লীগ হয়েছে তাও আমি জানি না। সে যদি নৌকা প্রতীক পায় কিছু বলার নেই। খুলনার তেরখাদা উপজেলা সদর ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন এফ এম অহিদুজ্জামান। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানো মনোনয়ন তালিকায় নাম ছিল না তার। অভিযোগ আছে, উপজেলার সবচেয়ে বড় রাজাকার পরিবারের সন্তান তিনি। তার পরিবারে তালিকাভুক্ত ১০ জন রাজাকার ছিল। তার পিতা ভাষা ফকির ওরফে বাশার ফকির একজন রাজাকার। এ ছাড়াও তার দাদা, দুই চাচা, মামাসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা তৎকালীন থানা শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকার ছিলেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা অহিদুজ্জামান ২০১০ সালে দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতির শূন্য পদে নাম লেখান। ছাত্রলীগ, যুবলীগ না করলেও অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল আর আর্থিক ক্ষমতার জোরে ২০১৪ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে যান অহিদুজ্জামান।

জানা যায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে এফ এম অহিদুজ্জামানের মানহানিকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ২৬ জুলাই জেলা আওয়ামী লীগের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি বরাবরে সুপারিশ করে জেলা কমিটি। অহিদুজ্জামানের দাবি, এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে জেলা আওয়ামী লীগ বলছে, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি তাদের জানা নেই। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় খুলনা জেলা ও মহানগরীর চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায়ও নাম ছিল এফ এম অহিদুজ্জামানের। সূত্রঃ বিডি প্রতিদিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here