অনলাইন ডেস্কঃ পবিত্র ঈদুল ফিতরের বাজারে গিয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর ভোজ্যতেল পাচ্ছেন না ক্রেতারা। যেসব দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সয়াবিন তেলের বোতলের সঙ্গে ক্রেতাদের সরিষার তেল, চা অথবা অন্য কোনো পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।

শুধু সরবরাহ ঘাটতি নয়, বাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের ১ লিটারের বোতলের সরকার নির্ধারিত দাম ১৬০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা দরে। আর ৫ লিটারের বোতল কেনা যাচ্ছে ৭৮০ টাকায়, যার নির্ধারিত দর ৭৬০ টাকা। পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানে দাম আরও বেশি।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খোলা তেলের দাম। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বৃহস্পতিবারের বাজারদরের তালিকা বলছে, ঢাকার বাজারে এখন খোলা সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের সর্বনিম্ন দর ১৮৪ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ২৯ টাকা বেশি। একইভাবে লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে পাম সুপার তেল।

খোঁজ নিয়ে ভোজ্য–তেলসংকটের নেপথ্যে দুটো বড় কারণ জানা গেছে। এক. পবিত্র রমজান মাস ও ঈদে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার আমদানি হয়েছে কম। দুই. ঈদের পরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়বে, এমন চিন্তা থেকে ব্যবসায়ীরা তেল মজুত রাখছেন।

বড় আমদানিকারক পরিশোধনকারীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে যে দর, সে অনুযায়ী দেশের বাজারে দাম বাড়াতে না দিলে আমদানি কমে যাবে। তাই সরকারের উচিত সরবরাহ বাড়াতে নজর দেওয়া।

শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানিকারক টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত সরবরাহ ঠিক রাখতে। বিশ্ববাজারে এখন ভোজ্যতেলের সংকট চলছে। এটাকে সংকট হিসেবে দেখা উচিত। এ জন্য আমদানিকারকদের অভয় দেওয়া উচিত, যাতে সরবরাহ ঠিক রাখা যায়।

বাজারের চিত্র

ঢাকার ধানমন্ডির রায়ের বাজারের ১৫টি মুদিদোকান ঘুরে গতকাল শুক্রবার ৪টিতে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যায়। বাকিগুলোতে নেই। ঢাকার কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটেও চিত্রটি মোটামুটি একই।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের খুচরা বিক্রেতা মো. মোখলেসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেল কিনতে গেলেই পরিবেশকেরা বিভিন্ন পণ্য ধরিয়ে দেয়। আজকে (শুক্রবার) আমাকে চার কার্টন (প্রতি কার্টনে ৫ লিটারের চার বোতল) তেলের সঙ্গে দেড় কেজি করে চা–পাতা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশক জানিয়েছে, চা–পাতাগুলো না নিলে তেল বিক্রি করা যাবে না।’

খুচরা বিক্রেতার এ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে একই বাজারের ভোজ্যতেলের পরিবেশক মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে কোম্পানির পরিবেশকেরা তেলের সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। সয়াবিন তেলের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে অন্য পণ্য কিনতে হয় কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

অবশ্য শীর্ষ পর্যায়ের আমদানিকারক টিকে গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা যথেষ্ট পরিমাণে তেল সরবরাহ করছেন। সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টন সয়াবিন ও পাম তেল সরবরাহ করছি। এপ্রিলের ২৬ দিনে সয়াবিন ও পাম তেল মিলিয়ে ৪৭ হাজার ৭৮৮ টন সরবরাহ করেছি। এই তেল কোথায় যায়?’

আমদানি কমছে

দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করে পূরণ করা হয়। সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করে বাজারে ছাড়ে। কেউ কেউ বীজ আমদানি করেও তা ভাঙিয়ে তেল উৎপাদন করে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, এ বছর ১ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৯২ হাজার টন, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে (১ মার্চ-২৮ এপ্রিল) ১ লাখ ৩৭ হাজার টন সয়াবিন তেল বন্দরের কাস্টম বন্ডেড ট্যাংক টার্মিনাল থেকে খালাস করেছে কোম্পানিগুলো।

আমদানিতে উৎসাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশে দামের পার্থক্যকে দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম অনেক বেশি। কিন্তু দেশে সরকার মূল্য সমন্বয় করতে দিচ্ছে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ গত ২০ মার্চ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬০ টাকা নির্ধারণ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য লেনদেনের বাজার বা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে গত ২১ মার্চ সয়াবিন তেলের দর ছিল প্রতি টন ১ হাজার ৬২৫ ডলার। গত বৃহস্পতিবার একই তেল লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৯৯৭ ডলারে, অর্থাৎ এ সময়ে দাম বেড়েছে প্রতি টনে ৩৭২ ডলার, যা লিটারে ২৯ টাকায় দাঁড়ায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে উৎপাদনে ঘাটতি হওয়ায়। ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা সয়াবিন তেল রপ্তানি সীমিত করেছে। ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

ভোজ্যতেলের এ ঘাটতি মেটাতে কী করা উচিত, জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, এখন তদারকি বাড়ানো উচিত। আমদানি বাড়াতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা যেতে পারে। বিশ্ববাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকায় দেশেও প্রয়োজনে মূল্য সমন্বয়ের দরকার হতে পারে। সূত্রঃ প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here