অনলাইন ডেস্কঃ প্রায় সাড়ে ৬ বছর আগে গাবতলীতে ঈগল পরিবহণের লাগেজ বক্সে একটি লোহার ট্রাংকে পাওয়া ২৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত নারীর লাশের পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যারহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।  এ ঘটনার সঙ্গে জাড়িত থাকার অভিযোগে শুক্রবার ভোরে ওই নারীর প্রেমিক রেজাউল করিম স্বপনকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ঘাতক রেজাউল করিম স্বপন দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ২০১৫ সালের ৩ মে সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের কে খান মোড়ে ঈগল পরিবহণের কাউন্টারে টিকিট কেটে একজন ব্যক্তি একটি ট্রাংক তুলে দেয় বাসের লাগেজ বক্সে। বাসের হেলপারকে বলে, সামনের ভাটিয়ারী কাউন্টার থেকে ওই টিকিটের যাত্রী উঠবে। কিন্তু পরের ওই কাউন্টার থেকে যাত্রী না ওঠায় বাসটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করে এবং বিকাল পৌনে ৬টার দিকে বাসটি গাবতলী এসে পৌঁছায়। এরপর বাসের সব যাত্রী তাদের জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যায়।

ট্রাংকটি দেখতে পান বাসের হেলপার। তখন বাসের ড্রাইভার-হেলপার মিলে ট্রাংকটি নামিয়ে দেখেন এটি খুব ভারি। তাদের সন্দেহ হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে দারুস সালাম থানায় খবর দিলে রাত সাড়ে ৯টায় থানা পুলিশ এসে ট্রাংকটি খুলে একজন অজ্ঞাতনামা নারীর লাশ দেখতে পান। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন৷ ২০১৫ সালের ৩ মে রাতেই দারুস সালাম থানার এসআই জাহানুর আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামির নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আর পরিচয় না পাওয়ায় ওই তরুণীর লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। এই মামলাটি দারুস সালাম থানা পুলিশ তিন মাস তদন্ত করে। পরে তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। মামলাটি চার বছরের বেশি সময় তদন্ত করে সিআইডি। কিন্তু লাশের পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যা রহস্য কোনোটাই উদঘাটন করা যায়নি।

২০১৯ সালে মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে দাখিল করে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আদালত তদন্তের জন্য পিবিআইকে দেন। পিবিআই ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং কাজ শুরু করে। পিবিআই ঢাকা মেট্রোপলিটন (উত্তর) এর ইউনিট ইনচার্জ বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলমের তত্ত্বাবধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আশরাফুজ্জামান ভিকটিমকে শনাক্ত করার জন্য প্রচলিত সব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। প্রায় দেড় বছর তদন্তের পর অজ্ঞাত নারীর পরিচয় শনাক্তসহ ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত এক আসামিকেও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পিবিআই।

পিবিআই প্রধান বলেন, নিহতের নাম শম্পা বেগম। তিনি খুলনার দৌলতপুর থানার দেওয়ানা উত্তরপাড়ার ইলিয়াস শেখের মেয়ে।  হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি রেজাউল করিম স্বপনকে শুক্রবার ভোরে কুমিল্লার ইপিজেড এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

তিনি বলেন, তদন্ত করতে গিয়ে চট্টগ্রাম শহর ও জেলা এলাকার সব থানায় ২০১৫ সালে নিখোঁজ জিডির অনুসন্ধান শুরু হয়। সেখানে ১০-১২টি নিখোঁজ জিডির তথ্য উদঘাটন করা হয়। জিডিগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালের ১০ জুন তারিখের একটি জিডিতে (৫৯৯) দেখা যায় শম্পা বেগম চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। ওই ঘটনায় নিহত শম্পা বেগমের ভগ্নিপতি আব্দুল মান্নান পাহাড়তলী থানায় জিডিটি করেন।

পিবিআই প্রধান আরও বলেন, ওই জিডির সূত্র ধরে তদন্তকারী কর্মকর্তা জিডিকারী আব্দুল মান্নান ও নিহত শম্পা বেগমের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য ইলিয়াস শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ২০১৩ সালে রেজাউল করিম স্বপন (অবসরপ্রাপ্ত নৌ বাহিনী সদস্য) খুলনা তিতুমীর নৌঘাঁটিতে কর্মরত থাকাকালীন শম্পা বেগম একটি হাসপাতালে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। ওই হাসপাতালে ইলিয়াস শেখের স্ত্রীর চিকিৎসার সুবাদে শম্পার সঙ্গে রেজাউলের পরিচয় হয়। পরিচয়ের একপর্যায়ে প্রথমে প্রেম হয়। পরে শম্পা বিয়ের জন্য চাপ দিলে রেজাউল বদলি হয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। ভুক্তভোগী শম্পাও কিছুদিন পরে চট্টগ্রামে তার এক ফুফুর বাসায় চলে যান।

এরপর ফয়েস লেক এলাকায় একটি হোটেলে কিছুদিন অবস্থান করে তারা। তারপর পাহাড়তলী থানাধীন উত্তর নিভিউ আবাসিক এলাকায় একটি টিনশেড বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সাবলেট হিসেবে বসবাস শুরু করেন দুজনে। এভাবে তারা ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বসবাস করেন। কিন্তু তারা বিয়ে করেননি।

পিবিআই প্রধান বলেন, দুইজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায় মনোমালিন্য দেখা দিত। ২০১৫ সালের ২ মে গভীর রাতে মনমালিন্য হলে শম্পাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে রেজাউল করিম স্বপন। এরপর আসামি লাশ গোপন করতে একটি ট্রাংকে ভরে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহণের একটি বাসে তুলে দেয় ঘাতক স্বপন। এদিকে শম্পার বাবাকে সে জানায়, শম্পাকে খুলনার বাসে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শম্পা তার বাবার বাড়িতে আর পৌঁছায়নি। এতে তারা বিভিন্ন স্থানে খোঁজা-খুঁজি করে না পেয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানায় একটি জিডি করেন শম্পার ভগ্নিপত্তি আব্দুল মান্নান। এরপর ভুক্তভোগীর বাবা ২০১৫ সালের ২৭ মে আসামি রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নৌবাহিনী চট্টগ্রাম অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

তিনি বলেন, গোপন তদন্তের ভিত্তিতে জানা যায়, আসামি রেজাউল করিম স্বপনের বিষয়ে তার বাহিনী তদন্তে করে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ২০১৯ সালে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। সূত্রঃ যুগান্তর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here