অনলাইন ডেস্কঃ ”অজানা সবই আমার কাছে আকর্ষণীয়। ছোটবেলা থেকে পাথর এবং সময় আমায় ভাবাত। সময় চতুর্থ মাত্রা- যা দেখা যায় না, স্পর্শ করা বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আবার একটি পাথর যেমন বিশাল এক সময়কাল নিজের গহিনে ধারণ করে তার পুনঃআকার নেয়, তেমনি মানুষের ভেতরেও লুকিয়ে আছে, মায়ের গর্ভ থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত পুরো জীবন। আমি পাথরের ভেতরে সময়কে দেখতে পাই। আবার কখনও কখনও সময় আমার কাছে পাথররূপে আবির্ভূত হয়। তাই আমার একক চিত্র প্রদর্শনীর শিরোনাম দিয়েছি ‘প্রস্তরকাল’।

এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া পাথর অথবা যে কোনো বিষয়ক চিত্রকর্মগুলোতে রয়েছে আমারই প্রতিচ্ছবি বা সেলফ পোর্ট্রেইট।’- এভাবেই নিজের সপ্তম একক প্রদর্শনী প্রসঙ্গে বললেন বরেণ্য অভিনেত্রী ও চিত্রশিল্পী বিপাশা হায়াত।গত ১৬ এপ্রিল শনিবার থেকে ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে ‘প্রস্তরকাল’ শিরোনামে বিপাশা হায়াতের একক চিত্র প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। বিপাশার শিল্পকর্ম নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিপাশার এই প্রদর্শনীর কার্ড যখন হাতে পেয়েছি, তখন দেখি তাতে লেখা স্টোন টাইম বা পাথর সময়। তখন খেয়াল করলাম- হঠাৎ বিপাশার কী হলো! পরে বুঝলাম আসলে পাথর সময়, করোনার কারণে আমরা যে সময়টা অতিবাহিত করলাম, করছি, সামনে যে ভালো সুদিন দেখছি তাও নয়; রোগবালাই থেকে শুরু করে সব মিলে আমাদের একটা দুর্যোগের সময় কাটিয়ে দিলাম। তখন আমার ধারণা হলো, ও একটা সিম্বল করেছে যে, পাথর সময়।’ বিপাশার ‘প্রস্তরকাল’ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বিপাশার আঁকা বিভিন্ন মাধ্যমের তিন শতাধিক শিল্পকর্ম।বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক বিচ্ছিন্নতা, মহামারি, সংকট সময় এবং মানুষের অপরিসীম অন্তর্নিহিত শক্তিকে শিল্পী বিপাশা হায়াত চিহ্নিত করেছেন ‘প্রস্তরকাল’ হিসেবে। বিপাশা জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত আঁকা শিল্পকর্মগুলো স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে। বিপাশা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর গত আড়াই বছরে যে কাজগুলো করেছি, মূলত সেগুলো নিয়েই এই প্রদর্শনী।’

এসব চিত্রকর্মে কোন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে, জানতে চাইলে বিপাশা বলেন, ‘সহজ ভাষায় যদি বলি, আমার জীবনযাত্রায় যখন যা যুক্ত হয়েছে, চারপাশে যা ঘটেছে, চারপাশের প্রকৃতি যেমন ছিল, সেই সময় মনের ভেতরে যা চলেছে, তা-ই আমার কাজে উঠে এসেছে। এসবকে আসলে আমি ছবি বলতে পারি না। এসব আমার ডায়েরির পাতা বলা যেতে পারে। কারণ প্রতিটি ছবির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সেই সময় বা সেই দিনের ঘটনার কথা।’

বিপাশা আরও বলেন, ‘আমার এই প্রদর্শনীর জন্য আমি ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ চিত্রকের কর্ণধার মনিরুজ্জামান ভাই ও জহির ভাইয়ের কাছে। তারা আমাকে তিন বছর আগে একদিন পোল্যান্ডের ওয়ারশতে আমাদের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান ভাইয়ের বাড়িতে বললেন, ‘তুমি যদি এক্সিবিশন করতে চাও জানিও। আমরা গ্যালারি চিত্রক নতুনভাবে সাজিয়েছি। সেখানে তোমার আমন্ত্রণ। এরপর মাসখানেক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রদর্শনী করব। জানতে পারলাম মাহফুজ ভাই ঢাকায় এবং তিনি ক্যাটালগে আমার কাজ নিয়ে লিখবেন। তখন একমূহূর্ত সময় নষ্ট না করে ঢাকার টিকিট কনফার্ম করলাম। আমার এই প্রদর্শনীটা কিউরেট করছেন অপার জামান।’

এত দিন দেশের বাইরে ছিলেন। যদিও পরিবারের সবার সঙ্গে ভিডিও কলে নিয়মিত কথা হয়েছে। এরপরও যখন এতটা সময় পর বাংলাদেশের মাটিতে নামলেন। কেমন মনে হয়েছিল? ‘সত্যি বলতে কি আমি যে এতদিন পর দেশে ফিরেছি, তা বুঝতেই পারিনি। এই যে গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিন গ্যালারি চিত্রকে আসছি, যাচ্ছি। সবই আগের মতো রয়েছে।’

বিপাশা হায়াত ১৯৯৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে এমএফএ পাস করেন। চারুকলার সেই সময়টাকে জীবনের অসাধারণ সময় মনে করেন বিপাশা। তিনি বলেন, ‘চারুকলায় ১৯৯২-৯৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। এই সময়ের চারুকলার কথা আমি খুব একটা জানি না। সবাই বলে, আমাদের সময়টায় খুবই ভালো ছিল। আমি তো বলব, আমাদের সময়ে শিক্ষকদের চমৎকার পেয়েছি। ছাত্রদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ছিল। সহযোগিতা, সহমর্মিতা সব মিলিয়ে আমার মনে হয় অসাধারণ। আমি আজ যা কিছু, এই গড়ে ওঠার পেছনে চারুকলা ও থিয়েটার।’

বিপাশা মানেই ছোটপর্দায় বিভিন্ন চরিত্রের দাপুটে অভিনেত্রী। কী মঞ্চ, কী টিভি নাটক অথবা চলচ্চিত্রে সব ক্ষেত্রেই তার দ্যুতি ছড়ানো প্রতিভা। তার চিরচেনা প্রাণবন্ত হাসি যেন দর্শকমন ভরিয়ে দেয়। তাই জানতে চাই এই যাত্রায় অভিনয়ে পাওয়া যাবে কী? ‘এই যাত্রাই মাত্র তিন সপ্তাহের জন্য এসেছি। আগামী ২৪ এপ্রিল চলে যাব। কারণ ওখানে ছেলেমেয়েরা রয়েছে। তাই এবারে অভিনয় হচ্ছে না। আর অভিনয়ে একেবারেই মিস করি না তা নয়। মাঝেমধ্যে মিস করি। তবে এখন আমি মঞ্চে কাজ করতে বেশি আগ্রহী।’ সূত্রঃ সমকাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here